মুহাম্মদ হানিফ আজাদ:
নতুন বছরকে বরণ করতে দেশী-বিদেশী পর্যটকের পদ চারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে পর্যটন স্পট গুলো। ইতি মধ্যে হোটেল মোটেল, কটেজ গুলোতে মজুদ করা হচ্ছে ইয়াব ও হেরোইন মাদকদ্রব্য। ২০১৫ ইংরেজী নববর্ষকে বরণ করতে আমোত পূর্তিতে মেতে উঠতে শত কোটি টাকার মাদক দ্রব্য বিকিনির হাট বসবে। এ লক্ষ্যে সীমান্তের মাদক পাচারকারীর সিন্ডিকেট তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে বলে সূত্রে জানা গেছে।
মিয়ানমারের অর্ধ শতাধিক কারখানা থেকে তৈরীকৃত কোটি কোটি টাকার মরণনেশা ইয়াবা বড়ি সাগর ও স্থল পথ দিয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ৭৬৪ জন ইয়াবা পাচারকারী থাকলেও বেশির ভাগ রয়েছে গেছে ধরাছোয়ার বাইরে। যার ফলে ইয়াবা পাচারকারী গডফাদররা বেপরোয়া হয়ে মরণ নেশা ইয়াবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর এ কারণে এক দিকে ধ্বংস হচ্ছে যুব ও ছাত্র সমাজ আর অপরদিকে অবনতি হচ্ছে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির। ইয়াবা পাচার রোধে সরকার কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করলেও তারা এত বেপরোয়া কেন এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে মাঝে মধ্যে ইয়াবা ও মাদক পাচারকারী ধরা পড়লেও গডফাদারেরা এখনো অধরা। যার ফলে মরণ নেশা ইয়াবা ও মাদকদ্রব্য পাচার কোন মতেই থামছেনা।
এছাড়াও স্থল পথে কড়াকড়ি আরোপ হওয়ায় পাচারকারী সিন্ডিকেট সাগর পথকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেচে নিয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে পাচার হয়ে আসা ইয়াবা সাগর পথে চট্টগ্রাম বন্দরে দু’দফা ১ লাখ ৮০ হাজার পিচ ইয়াবার চালান ধরা পড়ায় সীমান্তের তোলপাড় সৃষ্টি হয়। কিছুদিন পূর্বে ইয়াবা পাচারকারীদের সাথে বন্দুক যুদ্ধের ঘটনায় টেকনাফে র্যাব, কোষ্টগার্ড, পুলিশের হাতে ৬ জন গড ফাদার নিহত হলেও ইয়াবা পাচার রোধ করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি চট্টগ্রামে গভীর রাতে কোষ্টগার্ড সদস্যরা সাড়ে ৭ কোটি টাকার ইয়াবা বড়িসহ ইয়াবা ব্যবসায়ী আজিজকে আটক করে। কিছুদিন আগে কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের শীর্ষ ইয়াবা পাচারকারী হেলাল উদ্দীন (৪৫) ও তার ৩ সহযোগীকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ ঢাকা যাত্রাবাড়ী মাতুয়াইল এলাকা থেকে আটক করেছে র্যাব-১০। ওই সময় তাদের কাছ থেকে ৩০ হাজার পিচ ইয়াবা, ১২ লাখ নগদ টাকা, ১টি মোটর সাইকেল, ১৩টি মোবাইল উদ্ধার করা হয়। আটক হেলালের সহযোগিরা হলেন, গণি আমিন (৫০), নাজমুল হাসান (২৭) ও ইব্রাহীম হাওলাদার (২৬)। র্যাবের হাতে আটক হেলাল উদ্দীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারী। তার বিরুদ্ধে টেকনাফসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। সে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা গ্রামের জালাল আহমদের ছেলে। সোমবার রাতে মরিচ্যা বিজিবির সদস্যরা টেকনাফ থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী একটি লবণ বোঝাই গাড়ীতে তল্লাশি চালিয়ে ৫ হাজার ৮শ পিচ ইয়াবাসহ ট্রাকটি জব্দ করেছে।
অনসুদ্ধানে জানা যায়, উখিয়া সীমান্তের বালুখালী, পালংখালী, আঞ্জুমানপাড়া, ধামনখালী ও টেকনাফ উপজেলার শাহরীরদ্বীপ, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ সদর, সাবরাং, নয়াপাড়া, মিস্ত্রী পাড়া, বাজারপাড়া, মৌলভী বাজার, হ্নীলা, হোয়াইক্যং, ঝিমনখালী, দমদমিয়া, নাইট্যংপাড়া, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম, তুমব্র“, বাইশপারি, রেজু আমতলী, আছারতলি, চাকঢালাসহ প্রায় অর্ধশতাধিক পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার থেকে মরণ নেশা ইয়াবা ও বিভিন্ন প্রকারের মাদকের চালান ঢুকছে।
জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে সীমান্তে বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রতিনিয়ত পাচার হয়ে আসছে এ দেশে ইয়াবার চালান। এসব ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব সদস্যদের সাথে কয়েক দফা বন্দুক যুদ্ধের ঘটনাও ঘটেছে। আহত হয়েছে একাধিক বিজিবি ও পুলিশ সদস্য। নিহত হয়েছে ইয়াবার গডফাদার নুর মোহাম্মদ, জাহেদ হোসেন জাকু, ফরিদ আলম, আমিন মাঝি, মোঃ কালু, জহির আহমদসহ ৬ জন।
তাছাড়াও কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তের অর্ধশতাধিক পয়েন্টে মরণ নেশা ইয়াবা পাচার অব্যাহত রয়েছে। আর এতে রোহিঙ্গাসহ জড়িত রয়েছে প্রায় অর্ধহাজার নারী-পুরুষ। যার ফলে সীমান্ত এলাকা এখন ইয়াবার স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। সীমান্তে দায়িত্বে নিয়োজিত বিজিবি, র্যাব, কোষ্টগার্ড ও পুলিশ সদ্যসরা একের পর এক অভিযান চালিয়ে ইয়াবা ও বিভিন্ন মাদক দ্রব্যের চালান উদ্ধার করতে পারলেও শীর্ষ ইয়াবা পাচারকারীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকায় কোন মতেই ইয়াবাসহ মাদক পাচার থামছে না। যার কারনে সীমান্তে দায়িত্বে নিয়োজিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন ইয়াবা প্রতিরোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের শতাধিক নেতাকর্মী এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করলেও তাদের গায়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আচঁড় লাগছে না। শুধু তাই নয় এ ব্যবসায় কতিপয় সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তিও জড়িত রয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রনীত ইয়াবা পাচারকারীর তালিকা অনুযায়ী র্যাব-পুলিশ, বিজিবি যৌথ এবং পৃথক অভিযান চালিয়ে ইয়াবা পাচারকারীদের ধরপাকড় অভিযান অব্যাহত রাখায় চিহ্নিত পাচারকারীরা গা ঢাকা দিলেও পাচার থামেনি। চোরাকারবারীরা ইয়াবা পাচারের রুট পরিবর্তন করে এখন সমুদ্র পথ ছাড়াও স্থল পথে ইয়াবা পাচার অব্যাহত রেখেছে। টেকনাফ কোষ্টগার্ড সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সাগরে টহল দেওয়ার সময় ইয়াবা পাচারকারীদের সাথে কোষ্টগার্ড সদস্যদের বন্দুক যুদ্ধে ৩ জন পাচারকারী নিহত হয় এবং ধাওয়া করে ৫ জনকে আটক করে ১৫ জনের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
কক্সবাজার ১৭ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল খন্দকার সাইফুল আলম জানান, ইয়াবাসহ যে কোন ধরনের মাদক প্রতিরোধে বিজিবি সদস্যরা সতর্কাবস্থায় রয়েছে। আর যে সমস্ত মাদক বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে সেগুলো বিজিবির বিওপি সদস্য ও চেকপোষ্টে অভিযান চালিয়ে আটক করছে।
টেকনাফ ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল আবু জার আল জাহিদ বলেন, নতুন বছরকে বরণ করতে দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের ভিড় করায় মাদক পাচারকারীরা এ সুযোগকে যাতে কাজে লাগাতে না পারে সে ব্যাপারে সীমান্তে ও সড়ক পথে নিয়োজিত বিজিবি সদস্যদের সজাগ থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাঠকের মতামত