
গফুর মিয়া চৌধুরী:
কক্সবাজারের উখিয়ার পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে মহান বিজয়ের মাসকে ব্যবহার করে চলছে জুয়ার আসর সহ নানা অনৈতিক কর্মকান্ড। স্থানীয় আ’লীগের কয়েকজন নেতা মিলে বসিয়েছে অপকর্মের হাট। এ হাটে চলছে প্রতিদিন জুয়া, পুতুল নাচ-গান, র্যাফেল ড্র, সাবান খেলা, চাকতি খেলা, মৃত্যুকোপসহ বিভিন্ন লোভনীয় অবৈধ খেলা চালিয়ে আদায় করছে লক্ষ লক্ষ টাকা।
মেলা আয়োজনকারী কতিপয় নেতাকর্মীরা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা উদযাপনের নামে প্রতিনিয়ত মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননার মত অশ্লীল নৃত্যের আসর বসিয়ে এক বেহায়াপনা কর্মকান্ড চালিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। উখিয়ার ব্যস্ততম বাণিজ্যিক স্টেশন কোটবাজারের পাশে এই আয়োজন হওয়ায় লোকজনের সমাগমও বেড়েছে প্রচুর। বিজয়ের মাসকে পুঁজি করে এক শ্রেণীর মানুষ হাতিয়ে নিচ্ছে মানুষের সর্বস্ব। এই মেলায় গিয়ে সবাই পকেট খালি করে বাড়ি ফিরছে। অবৈধ এ মেলার কারণে এলাকায় চুরি, ছিনতাই, অনৈতিক কর্মকান্ড সহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর প্রভাব পড়ছে। ফলে উখিয়ার আইন শৃঙ্খলা অবনতির দিকে এগোচ্ছে। প্রশাসন চাইলে বন্ধ করে দিতে পারে অবৈধ এই আয়োজন। তবে প্রশাসন নিরব থাকারও অভিযোগ উঠেছে।
সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, উঠতি বয়সী যুব সমাজসহ স্কুল, কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীরা জুয়া, পুতুল নাচ, র্যাফেল ড্র, সাবান খেলা, চাকতি খেলা, মৃত্যুকোপসহ বিভিন্ন লোভনীয় অবৈধ খেলা জড়িয়ে পড়ে সবকিছু হারিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে। ফলে নৈতিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মেলার নামে আসলে চলছে জুয়া সহ নানা অনৈতিক কার্যকলাপ। সুশীল সমাজের উপস্থিতি না থাকলেও সাধারণ মানুষ সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ জুয়া খেলায় অংশ নিয়েছে। জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা।
গত ১৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ বিজয় মেলায় রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির থেকে ওই আওয়ামীলীগ কতিপয় নেতারা টাকার বিনিময়ে উঠতি বয়সের রোহিঙ্গা তরুণী ভাড়া করে নৃত্যের আসর বসিয়েছে। অবশ্যই এসব অবৈধ জুয়া ও উলঙ্গ নৃত্য বানিজ্যের নেপথ্যে রাজাপালং এলাকার উত্তর পুকুরিয়া গ্রামের পেশাদার জুয়াড়ী এস কামাল নামের ব্যক্তি। রাত এলেই জুয়ার আসরের পাশা-পাশি মদ্যপায়ীদের আচরণে অতিষ্ট হয়ে উঠছে স্থানীয় জনসাধারণ ও পথচারীরা। অভিযোগ উঠেছে গত বৃহস্পতিবার রাতে বেলাল নামে এক যুবক ইয়াবা সেবন ও মদ্যপ অবস্থায় মেলার দর্শনার্থী এক প্রবাসীর স্ত্রীকে শ্লীলতাহানীর চেষ্টা করে। এধরণের অহরহ ঘটনা ঘটলেও আইন শৃংখলা বাহিনী ওই মেলা বন্ধ করতে উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ সচেতন মহলের।
ক’দিন পরেই এসএসসি ও দাখিল সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এদিকে ১৫দিন ব্যাপী বিজয় মেলার নামে জুয়া ও বেহায়াপনা চলতে থাকলে পরীক্ষার্থী ছাত্র/ছাত্রীরা পড়া-লেখায় বিঘিœত হওয়ার অভিযোগ করেছে অভিভাবক মহল। রতœাপালং ইউনিয়নের জাফর আলম নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, তার ছেলে এবারে এসএসসি পরীক্ষার্থী। কিন্তু সে রাতভর উক্ত বিজয় মেলার নামে জুয়া, অশ্লীল নৃত্যের আসরে মগ্ন হয়ে থাকে। এতে তার পড়া-লেখার চরম ব্যাঘাত ঘটছে। এধরনের আরো শত শত পরীক্ষার্থী ছেলে-মেয়েদের পিতা-মাতার অভিযোগ অহরহ।
উক্ত মেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারন অনুষ্ঠানের কথা বলা হলেও শুক্রবার রাতে দেখা যায়, ওখানে কোন ধরণের স্মৃতিচারন অনুষ্ঠান হয়নি। প্যান্ডেলের ভিতরে পুর্বপাশে পুতুলের নাচের নামে জ্যান্ত পুতুল নাচিয়ে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পাশে সাবান ও চাক্কা খেলায় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পড়–য়া ছাত্ররা লাইন ধরে দাঁিড়য়ে এ খেলায় সর্বশান্ত হচ্ছে। উত্তর পাশে মৃত্যুকুপে মোটর সাইকেল খেলার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। মধ্যবর্তী স্থানে লোভনীয় পুরুষ্কারের কথা বলে র্যাফেল ড্র চলছে। পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশে ৬ টি জুয়ার আসর বসিয়ে নির্বিঘেœ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে অনৈতিক কর্মকান্ড। শতাধিক লাঠিয়াল বাহিনী ওই মেলার সার্বক্ষনিক পাহারা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের পকেটে রয়েছে স্বেচ্ছাসেবক কার্ড। স্থানীয়রা বিজয় মেলার নামে এসব অবৈধ কার্যকলাপ দ্রুত বন্ধ করা না হলে এলাকার আইন শৃংখলা অবনতির পাশা-পাশি উঠতি বয়সী যুবসমাজ অপসংস্কৃতির গ্রাস থেকে রক্ষা পাবে না। উল্লেখ্য বিজয় মেলাকে কেন্দ্র করে ২০০৮ সালে উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয় খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত তৎকালীন বিজয় মেলায় মুন্না নামের এক ১৩ বছরের শিশুকে রাতের আধারে মেলা থেকে অপহরণ করে বলাৎকার করে হত্যা করার পর উখিয়া ফরেষ্ট রেষ্ট হাউসের পিছনে ঢোবায় লাশ পুতিয়ে রাখে। এই অবৈধ মেলায় এধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে কিনা সে প্রশ্ন সচেতন মহলের। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে অবৈধ কার্যকলাপ বন্ধের দাবী জানিয়েছেন উখিয়াবাসী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয় মেলা আয়োজক পরিষদের সভাপতি আদিল উদ্দিন চৌধুরী মেলা পরিষদের ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি ওই কমিটি থেকে সরে দাঁড়াবেন বলে জানালেও পরে রাতের বেলায় দেখা যায় তিনিই অশ্লীল নৃত্যের মঞ্চে উঠে টিকেট বিহীন প্রবেশকারীদের বেরিয়ে যাওয়ার কথা বলে আয়োজকদের সহযোগিতার জন্য দর্শনার্থীদের আহবান জানান। বিজয় মেলা উদযাপন কমিটির মহাসচিব পরিমল বড়–য়া অসুস্থ থাকার অজুহাত দেখিয়ে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উখিয়া থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম খাঁন বলেন উখিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের কোন বিজয় মেলা হচ্ছে না। কোর্টবাজারে বিজয় মেলার নাম ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক আয়োজন করলে পুলিশ প্রশাসন তা প্রশ্রয় দেবে না। পুলিশ সুপারের নির্দেশ পেলেই অবৈধ মেলা আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হবে।
পাঠকের মতামত