
আনসারুল্লাহর দুই সদস্যের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি
আনিস রহমান:
দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ভিআইপিদের ওপর দূর নিয়ন্ত্রিত ড্রোন বা কোয়াড হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বোমা হামলার পরিকল্পনা করেছিল উগ্রপন্থি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। উগ্রপন্থি সংগঠনটির দুই সদস্য চাঞ্চল্যকর এ তথ্য দিয়েছে। গত মঙ্গলবারই এ দুজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। ওই দিন রাতে যাত্রাবাড়ী এলাকার একটি বাড়ি থেকে তানজিল হোসেন বাবু (২৬) ও গোলাম মাওলা মোহন (২৫) নামের দুই যুবককে গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকে ড্রোন বা কোয়াড হেলিকপ্টারের মতো দূর নিয়ন্ত্রিত (রিমোট কন্ট্রোল) ‘ফ্লাইং মেশিন’ তৈরির সরঞ্জাম, বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস, উগ্রমতবাদ সংবলিত পুস্তিকা উদ্ধার করা হয়।
আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের এ দুই সদস্যকে নিয়ে দুপুরে মিন্টু রোডে পুলিশের জনসংযোগ শাখায় এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে এই অভিযান ও গ্রেফতারকৃতদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানায়, তারা আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের সক্রিয় সদস্য। তারা দুজনই জঙ্গি দলের অন্যতম নেতা মাওলানা জসীম উদ্দিন রাহমানীর অনুসারী হিসেবে জিহাদি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। গ্রেফতারকৃতদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরও বলেন, ২৫/৩০ তলা কোনো ভবনের সমতুল্য কোনো উচ্চতায় উড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করার সক্ষমতা সম্পন্ন কোয়াড হেলিকপ্টার বা ড্রোন তৈরির সক্ষমতা অর্জনের জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছিল। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে তারা ভূমি থেকে ভূমিতে আক্রমণ কষ্টসাধ্য বলে এমন আক্রমণের পরিকল্পনা করছিল। ২৫/৩০ কেজি ওজনের যে কোনো বোমা বহনে সক্ষম কোয়াড হেলিকপ্টার তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। তাদের পরিকল্পনা ছিল ড্রোন হামলার। মনিরুল ইসলাম জানান, বেশ কিছুদিন আগে থেকেই গোয়েন্দা ও অপরাধতথ্য বিভাগের কাছে তথ্য ছিল যে, টেকনিক্যাল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের একটি অংশ ভিন্ন উপায়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের ওপর ব্যাপকমাত্রার হামলার পরিকল্পনা করছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতেই ডিবি এই অভিযান পরিচালনা করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের এই ড্রোন তৈরির দলটিকে চিহ্নিত করে গ্রেফতারের জন্য গোয়েন্দা পুলিশ ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার গোয়েন্দা পুলিশ ওই দলটির অন্যতম পরিকল্পনাকারীসহ দুজনকে গ্রেফতার করে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দলের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা হয়েছে।
গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা জানিয়েছেন, ড্রোন কিংবা কোয়াড হেলিকপ্টার তৈরি করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছবি তুলে সেসব স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করছিল তারা। যুক্তরাষ্ট্রের কথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে গত কয়েক বছর ধরে মনুষ্যবিহীন এই খুদে উড়োজাহাজ ব্যবহারের ফলে ‘ড্রোন’ নামটি এখন বিশ্বব্যাপী পরিচিত। এসব যানে সংবেদনশীল ক্যামেরা থাকে, যার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থানের জানান না দিয়েই শত্রুর ওপর নজরদারি করা যায়। আফগানিস্তানের যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কাজেও যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন ব্যবহার করছে। গোয়েন্দাগিরি ছাড়াও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, উদ্ধার অভিযানসহ বিভিন্ন কাজে এখন ড্রোন ব্যবহার করা হয়। মনুষ্যবিহীন বিমান নিয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎসাহী তরুণরা ক্যামেরা বহনে সক্ষম ছোট আকৃতির দূর নিয়ন্ত্রিত বিমান তৈরি করেছে। তবে বাংলাদেশের কোনো জঙ্গি বা উগ্রপন্থি সংগঠনের হাতে এ ধরনের প্রযুক্তি থাকার কথা এর আগে শোনা যায়নি। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নাম প্রথম আলোচনায় আসে গত বছরের শেষ দিকে। আগস্টে বরগুনা থেকে এ সংগঠনের প্রধান মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীসহ ৩১ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন ঢাকার মোহাম্মদপুরে জসীমের বাসা ও অফিসে অভিযান চালিয়ে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সিডিসহ উসকানিমূলক বই উদ্ধার করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা সে সময় বলেছিলেন, ‘জিহাদের’ মাধ্যমে সরকারকে হটানোর লক্ষ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম থানা থেকে অস্ত্র লুট ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করেছিল।
জসীমসহ এ সংগঠনের ১০ সদস্যের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্রও দিয়েছে পুলিশ।
পাঠকের মতামত