
ওবাইদুল হক আবু চৌধুরী::
বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী (এনজিও) সংস্থার আড়ালে কক্সবাজার ও (টেকনাফ, উখিয়াসহ) বান্দরবান জেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন সংগঠন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার নামে গোপনে চলছে এ তৎপরতা। চট্টগ্রামের একটি হোটেল থেকে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন এবং গ্লোবাল রোহিঙ্গা সেন্টারের পাঁচ নেতা ও টেকনাফ থেকে আরও তিনজন রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করে এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন পুলিশ ও গোয়েন্দারা। ভারতের হায়দারাবাদে আটক রোহিঙ্গা নাগরিক খালিদের টেলিফোনের সূত্র ধরে পুলিশ চট্টগ্রাম থেকে প্রথমে পাঁচ রোহিঙ্গা নেতাকে আটক করে। পৃথক অভিযানে পরে টেকনাফ থেকে আরও তিনজনকে আটক করা হয়।খবর অামাদের সময়
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিস্ফোরণকা-ের ঘটনা তদন্তে নেমে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএর গোয়েন্দারা গত সপ্তাহে হায়দারাবাদ থেকে রোহিঙ্গা নাগরিক খালিদকে গ্রেপ্তার করেন। আটককৃত রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের সক্রিয় সদস্য। কলকাতা সফররত বাংলাদেশি সাত সদস্যের গোয়েন্দা এবং এনআইএ তাকে জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রামে আটক পাঁচ রোহিঙ্গা নেতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়। তারা যে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার আড়ালে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলায় গোপনে জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে খালিদের জেরা থেকে। খালিদসহ চট্টগ্রামে আটক পাঁচ জঙ্গিকে জেরা করে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, বর্ধমান ও মালদহ জেলায় এক জঙ্গি জালের খোঁজ পান এনআইয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশি গোয়েন্দারা। যেসব তথ্যের ভিত্তিতে দুই দেশের গোয়েন্দারা যৌথ তদন্ত করছেন।
গত রোববার চট্টগ্রামে আটক হয় পাকিস্তানি নাগরিক ও গ্লোবাল রোহিঙ্গা সেন্টারের পরিচালক মো. আলম, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সৌদি নাগরিক আব্দুল মজিদ, সালামত উল্লাহ, নাই্যংছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও রোহিঙ্গাদের শীর্ষস্থানীয় নেতা মো. শফি উল্লাহসহ পাঁচজন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে তারা রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার নামে ৫০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহে মাঠে নেমেছে। এরই মধ্যে তারা ২৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। যে টাকায় মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ার কথা বলে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে তারা সংগ্রহ করে। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বেশ কয়েকজন তাদের নামে কোটি কোটি টাকা পাঠাচ্ছে বলেও গোয়েন্দাদের জেরার মুখে তারা স্বীকার করে। প্রাপ্ত টাকার একটি বড় অংশই রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের পেছনে ব্যয় করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ ও গোয়েন্দারা। পুলিশ ও গোয়েন্দারা এরই মধ্যে রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠনের বেশ কয়েকটি গোপন অ্যাকাউন্টের সন্ধান পেয়েছেন। যে অ্যাকাউন্টের লেনদেন সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেবে পুলিশ।
চট্টগ্রাম গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার কুসুম দেওয়ান গত রাতে আমাদের সময়কে বলেন, চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তারকৃত পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। তাদের ফের পাঁচ দিনের রিমান্ডে আনার জন্য আদালতে আবেদন জানানো হয়েছে। আজ রোববার শুনানি।
পুলিশ ও গোয়েন্দারা বলছেন, সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্র গঠন করতে কাজ করছে আরএসওসহ রোহিঙ্গাদের আরও বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন। তারা মিয়ানমারসহ কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার কিছু অংশ নিয়ে আলাদা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করছে।
দুই বছর আগে সরকার এনজিওর আড়ালে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে ফ্রান্সের ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স, অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গার ও যুক্তরাজ্যের মুসলিম এইড এনজিও কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়। এখন গ্লোবাল রোহিঙ্গা সেন্টার, করুণা, ইমাম মুসলিম, দারুল আনসার, সমন্বিত মানবিক উদ্যোগসহ বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের আড়ালে জঙ্গি কার্যক্রম চলছে। গত বছর গ্লোবাল রোহিঙ্গা সেন্টারের যাত্রা শুরু হয়। গত সেপ্টেম্বরে ভারতের দিল্লিতে এই প্রতিষ্ঠানের ভারত শাখা খোলা হয়। গ্লোবাল রোহিঙ্গা সেন্টারের পেছনে কুশীলব হিসেবে কাজ করছে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ। রোহিঙ্গাদের জঙ্গি সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সঙ্গে এই সংগঠনের গভীর সখ্য। ছালামত ও শফিউল্লাহ বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তার আড়ালে আরএসওর জঙ্গি তৎপরতায় আর্থিক সহায়তা করে থাকে বলে পুলিশ ও গোয়েন্দারা প্রমাণ পেয়েছেন। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ এবং পুনর্বাসনের বিষয়টিও তারা দেখভাল করে থাকে।
পাঠকের মতামত