ঢাকা, , সোমবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯

নিজদেশে পরবাসী: এখনই পদক্ষেপ নিন

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-৩০ ০৯:৩৫:২২ || আপডেট: ২০১৯-০৮-৩০ ০৯:৪০:০২

হাশেম সৈকত :

মায়ানমার হতে বিতাড়িত হয়ে এগার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ আগস্ট মাসে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে গিয়ে উখিয়া টেকনাফ তথা কক্সবাজারের মানুষ তাদের কে সাধ্যমত সাহায্য করেছে, তাদের জন্য ভাত-পানি কাপড়ের ব্যবস্থা করেছে। তাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে উখিয়া টেকনাফের বিশাল বনাঞ্চল কেটে। আশা করেছিল জাতিসংঘ ও মায়ানমারের সাথে মধ্যস্থতাকারী দেশ ও দাতাগোষ্ঠীর সহযোগিতায় রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবাসন হবে। কিন্তু প্রত্যাবাসন উদ্যোগ দুইবার ব্যর্থ হওয়ায় স্থানীয়রা নানা কারণে এখন আতংকিত। কারণ প্রতিনিয়ত স্থানীয়দের সাথে রোহিঙ্গারা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হচ্ছে। স্থানীয়রা চরম হতাশার মধ্যে দিন পার করছে। দুই বছর পূর্বের মানবতা, এখন মাথা ব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত পঁচিশ আগস্ট রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সরকারের অনুমতি বিহীন বিশাল মানুষের গণজমায়েত দেশবাসী কে ভাবিয়ে তুলেছে। গণ জমায়েতে রোহিঙ্গা নেতাদের উত্থাপন করা পাঁচটি শর্ত পূরণ না হলে, তারা স্বদেশ প্রত্যাবাসন করবেনা-মর্মে ঘোষণা দিয়েছে। গণ জমায়েত কে কেন্দ্র করে দেশের মানুষ নানাভাবে হিসাব কষতে শুরু করেছে। কেননা উনিশ শত একানব্বইতে যারা মায়ানমার হতে পালিয়ে এসেছিল তাদের একজনেরও স্বদেশ প্রত্যাবাসন হয়নি। স্থানীয়দের মধ্যে আশংকা আদৌ রোহিঙ্গা ফিরে যাবে তো?

রোহিঙ্গারা শরণার্থী হিসাবে বাংলাদেশে অবস্থান করলেও এখানে পাচ্ছেনা এমন কিছুই নাই, যা মায়ানমারে কখনো কল্পনাও করেনি। দেশি ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা তাদের কে প্রয়োজনীয় সব দিচ্ছে এবং তা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। কিছু খেয়ে বাকিটা বিক্রি করে অঢেল টাকার মালিক হচ্ছে। রোহিঙ্গারা শরণার্থী হিসাবে থাকলেও, আইনলঙ্ঘন করে বিভিন্ন এনজিও তাদের কে ক্যাম্পে চাকরি দিয়েছে। তারা দেশের সব জায়গায় নির্বিঘ্নে যাতায়াত করছে। শ্রমিক হিসাবে কক্সবাজারের শ্রমবাজার দখলে নিয়েছে। তাছাড়া ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। দিনদিন তারা অপরাধ মূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। দৈনিক কালের কন্ঠের রিপোর্ট অনুযায়ী দুই বছরে ক্যাম্পে অনেকে রোহিঙ্গা কোটিপতি বনেগেছে।

রাতেরবেলা ক্যাম্প দখল করে নেয় নানা সন্ত্রাসী গ্রুপ। রাতে চলে তাদের রামরাজত্ব। মতের অমিল হলেই নিজেদের মধ্যে খুন করে বসে। রোহিঙ্গাদের হাতে অপহরণ ও খুন হয়েছে অনেক স্থানীয়। ক্যাম্পে আছে হজারের অধিক হত্যা মামলার আসামি। যোগসূত্র রয়েছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে। মানবতাবাদী হিসাবে যে ওমর ফারুক খালি হাতে আসা রোহিঙ্গাদের ভাত-পানি দিয়েছিল, তাকেই ২৩ আগস্ট ২০১৯ বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।

রোহিঙ্গারা নানা কৌশলে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। নানা কায়দায় জন্মনিবন্ধন, এনআইডি কার্ড ও পাসপোর্ট বানিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছে। সেখানে তারা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে, এতে বিদেশে বাংলাদেশে সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এবং দেশে ইয়াবাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে তারা স্বদেশ প্রত্যাবাসন চেয়ে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকার চিন্তা করছে।

পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও তাদের প্রত্যাবাসন না করার জন্য নিরুৎসাহিত করার অভিযোগ রয়েছে। বসবাসের পূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত, বাংলাদেশে অবস্থান করার কথা বলছে। নোয়াখালীর ভাসান চরে একলক্ষ রোহিঙ্গা কে স্থানান্তর করার জন্য সবকিছু তৈরি হলেও এনজিও বাধার মুখে তা বাস্তবায়িত হয়নি। শুনতে পাই এনজিও গুলো রোহিঙ্গাদের নগদ টাকা ও বিতরণ করছে। পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে রোহিঙ্গাদের মদদ দিচ্ছে এনজিও। ২৫ আগস্ট স্বদেশ ত্যাগের দুই বৎসর পূর্তি অনুষ্ঠানে এনজিও ব্যানার, প্লেকার্ড, টিশার্ট সরবরাহ করেছে। কোন দেশের পাসপোর্ট নিয়ে, কার সহযোগিতায় মাস্টার মুহিবুল্লাহ প্রিয়া সাহার সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প র সাথে দেখা করতে গিয়েছিল?

এদিকে গত ২৬ আগস্ট ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ এনজিও মুক্তি কক্সবাজার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরিকৃত ছয়শত দেশীয় অস্ত্র উখিয়া কোর্টবাজারের ভালুকিয়া সড়ক হতে প্রশাসন কতৃক জব্দ করা হয় । এইভাবে এনজিওদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। এনজিও, জাতিসংঘ ও মায়ানমারের সাথে মধ্যস্থতাকারী দেশের কার্যকর ভূমিকার অভাবে বারবার প্রত্যাবাসন উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে।

রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রণে করনীয় –
১. রোহিঙ্গাদের অবৈধ সিম কিনে মোবাইল ব্যাবহার বন্ধ করা।
২. খাদ্য সামগ্রী (প্রয়োজন মত) ছাড়া কোন কিছু বিতরণ না করা।
৩.রোহিঙ্গাদের সমস্ত চাকরি হতে চাটাই করা।
৪. ক্যাম্পের ভিতর ও বাহিরে সমস্ত দোকান /ব্যবসা বন্ধ করা।
৪. অবাধ চলাচল বন্ধ করা।
৫. দিনেরাতে ক্যাম্প নজরদারিতে রাখা।
৬. এনজিও দের জোরালো মনিটরিং করা।
৭. ক্যাম্পে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিন দায়িত্বে না রাখা।
৮. রোহিঙ্গাদের কোন পণ্য যেন ক্যাম্প হতে বের হতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা।
৯. রোহিঙ্গা নিয়ে কোন বাংলাদেশি শ্রমিক হিসাবে কাজ করালে তার শাস্তির বিধান রাখা।
১০.ক্যাম্পের বাহিরে রোহিঙ্গা পাওয়া গেলে তা দ্রুত ক্যাম্পে নিয়ে আসার জন্য স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা নেওয়া (প্রয়োজনে পুরস্কৃত করা)।

বাংলাদেশ সরকার কে রোহিঙ্গাদের বুঝাতে হবে তারা এই দেশের নাগরিক নয়, তারা- শরণার্থী। তাই তাদের নিজ দেশে ফেরত যেতে হবে। মায়ানমারে গিয়েই তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা ইস্যু কে শক্তভাবে নিয়ে জাতিসংঘ-মায়ানমারের সাথে মধ্যস্থতাকারী দেশ ও মায়ানমার কে নিয়ে ত্রিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে। এটি বাস্তবায়ন করার জন্য দরকার কূটনীতিক আলোচনা ও জোরালো তদবির অব্যাহত রাখা। ঝগড়া নয়-রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে শান্তি ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে মায়ানমার কে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন রাজি করাতে হবে। তা হলে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে।

লেখক : প্রভাষক, থানচি কলেজ, বান্দরবান।