ঢাকা, , শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯

অসাংবাদিকতা-অপসাংবাদিকতা : ধিক, শতধিক তাদের !

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-১০ ২৩:৩৯:২৪ || আপডেট: ২০১৯-০৮-১০ ২৩:৪২:৪১


আজাদ তালুকদারের টাইমলাইন থেকে…

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার সময় মার কাছেই পাঠটি নিয়েছিলেন। দোয়া-দরুদ পড়ে ছেলের মুখে মা ফু দিয়ে বললেন, শঠতার সমাজে, ঠকানোর সংস্কৃতিতে, জায়গায় জায়গায় প্রতারণার পাঁতানো ফাঁদে তোকে ছেড়েই দিলাম, যা…। মনে রাখিস ‘মানুষ’ হয়ে একদিন তোকেই লড়তে হবে অসাম্যের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অনৈতিকতার বিরুদ্ধে, অসুন্দরের বিরুদ্ধে, অসমাঞ্জস্যতার বিরুদ্ধে, অরাজকতার বিরুদ্ধে, অসততা ও অমানুষদের বিরুদ্ধে।

অসংখ্য ‘অ’যুক্ত সমাজে মায়ের এমন ‘অমোঘ বাণী’ সঙ্গী করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে পড়তে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন মায়ের সবেধন নীলমণি। মা আবার হাত রাখলেন মাথায়- ‘শোন, শোন- কোনো হাইজ্যাকার বাহিনী ধরলে ভুলেও বাড়াবাড়িতে যাসনে, সঙ্গে সঙ্গে সব দিয়ে দিবি।’

ঠিক আছে বলে স্বপ্নছোঁয়ার পথে পা রাখলেন সেদিনের ছেলেটি। গন্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিধিবাম, সেদিনই গুলিস্তান বাসস্টেশনে নেমে এক আগন্তুকের ধাক্কা। মনে পড়ে গেলো মায়ের কথা। ব্যস, তাতেই ওই লোকের হাতে সর্বস্ব তুলে দিলেন স্বাভাবিক ধাক্কা না হাইজ্যাকারের ধাক্কা কিছু বাচবিছার না করেই।

জীবনের শুরু থেকে এমন পোড় খেতে খেতে বড় হলেন নিম্মমধ্যবিত্ত পরিবারের শাসন-বারণের সরলরৈখিক তরুণটি। ৩৩ তম বিসিএস প্রশাসন-ক্যাডারে নিয়োগ পেলেন মেধাতালিকা স্পর্শ করে। সেই থেকে মায়ের শেখানো এবং নিজের দেখা সমস্ত ‘অ’-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ তার। প্রায় ছয় বছরের চাকরিজীবনে কাজটি ভালোভাবেই করছিলেন।

উখিয়ায় এসিল্যান্ড থাকাকালে মুখ থুবড়ে পড়ে মানবতার। তখন রোহিঙ্গা সংক্রান্ত সকল অমানবিকতার বিরুদ্ধে লড়েছেন সকল শক্তিমত্তা দিয়ে। সেই পারফরম্যান্স নজর কাড়ে সুন্দর-দুনিয়ায় নিরন্তর নিবিষ্ট মানুষ মো. আবদুল মান্নানের (চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার)।

ছবি : একরামুল সিদ্দিক

তিনিই মূলত নিয়ে আসেন ইস্পাত-কঠিন সততায় গড়া মানুষটিকে; বলছিলাম বোয়ালখালীর এসিল্যান্ড একরাম সিদ্দিকীর কথা। এখানে যোগ দিয়েই যথারীতি ‘অ’-বিরোধী যুদ্ধটি শুরু করেন। কিন্তু তাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ালো অসাংবাদিক, অপসাংবাদিক শক্তি। তাদের একের পর এক বিস্তৃত ষড়যন্ত্রের নতুন ‘সেনসেশন’ সরকারি প্রকল্পের মহিলা অফিসারকে এসিল্যান্ডের ‘শ্লীলতাহানি’।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠোদ্ধারের সময় থেকেই যার প্রবল নারীভীতি, নেহায়েত প্রয়োজন ছাড়া নারীদের কাছ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকেন; সেই তিনিই কিনা বুক চেতিয়ে এক নারীকে অফিসে তলব করে ‘শ্লীলতাহানি’র চেষ্টা করেছেন!

১৭ বছর ৩ মাস বয়সী কলেজছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করে পিতৃপরশে ‘জয়িতা’ হতে উব্ধুব্ধ করেন যিনি, প্রভাবশালী এমপি’র মোবাইল ফোন-উপহার ফিরিয়ে দিয়ে ২ হাজার টাকা দামের মোবাইল ব্যবহার করে স্বচ্ছতা-কৃচ্ছতার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেন যেই এসিল্যান্ড তিনিই কিনা দিনদুপুরে অফিস থেকে তিনপুরুষকে বের করে দিয়ে নারী অফিসারকে ‘শ্লীলতাহানি’ করে রাজস্থানের রাজা ‘কিষণ সিংহ’ হয়ে গেলেন! কী সেলুকাস!

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানতে পারি, একটি প্রকল্পে নারী অফিসারের সঙ্গে খণ্ডকালীন কাজ করতেন বোয়ালখালীর স্থানীয় এক সংবাদ প্রতিনিধি, যিনি নৈতিক স্খলনের অভিযোগে প্রকল্প থেকে সম্প্রতি কাজচ্যুত হলেও ওই নারী অফিসারের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখছিলেন। সরকারি অফিস কম্পাউন্ডে প্রকল্প অফিসে তাদের একাত্ম চলাফেরা বেশ দৃষ্টিকটু ঠেকলে স্থানীয়রা ভারপ্রাপ্ত ইউএনও একরাম সিদ্দিকীকে অনুরোধ করলেন নোংরা পরিবেশ রোধে নারীটিকে ডেকে অফিসে যুবকটির সংশ্লেষ ত্যাগ করতে যেন বলে দেন।

বুধবার ইউএনও ভদ্রমহিলাকে অফিসে ডেকে পাঠান। এসেই মেয়েটি আরো তিনজন মানুষের সামনে দাবি করলেন ওই যুবকের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক। তাতে কোনো সমস্যা নেই জানিয়ে ইউএনও বললেন, দয়া করে মেলামেশাটা অফিস কম্পাউন্ডে করবেন না। মেয়েটি তাতে রাজিও হলেন। এরপর চা-নাশতা খেয়ে ফিরে গেলেন।

পরদিন প্রেমিক সংবাদকর্মীসহ উপস্থিত হয়ে ডিসির কাছে ‘শ্লীলতাহানি’র লিখিত অভিযোগ করলেন তিনি। সাথে সাথে ডিসি অফিস ও বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর এই গল্পের নেপথ্য কুশীলব কারা।

মূলত এসিল্যান্ড একরাম সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ডানা মেলে এক শহুরে সাংবাদিক-কর্মকর্তার (!) অন্যায়-আবদার রক্ষা না করার পর থেকে।

ছয় মাস আগের ঘটনা। এসিল্যান্ড সাহেব জেলা প্রশাসক অফিসে গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে। এসময় ল্যান্ডফোন থেকে ফোন করে সেক্রেটারি স্যার কথা বলবেন বলে এক সাংবাদিক-কর্মকর্তাকে ধরিয়ে দিলেন একজন। মন্ত্রীপাড়ার সেক্রেটারি ভেবে হন্তদন্ত হয়ে ফোন ধরেই এসিল্যান্ড বললেন ‘আসসালামু আলাইকুম স্যার’।

ভাই কেমন আছেন-ওই প্রান্তের এমন সম্বোধনে থমকে যান এসিল্যান্ড। সেক্রেটারি হলে নিশ্চয় ‘ভাই’ বলতেন না। এসিল্যান্ড বুঝে গেলেন সচিব নয়। ছাত্রজীবনে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ওই সাংবাদিক-কর্মকর্তা এবার পরিচয়টা দিলেন। মস্ত এক ভাব নিয়ে বললেন-আমার একজন লোক যাবে আপনার কাছে, নামজারিটা করে দেবেন। ঠিক আছে পাঠিয়ে দিন, যথাসাধ্য চেষ্টা করবো-জবাবে বলেন এসিল্যান্ড।

পরদিনই সাংবাদিক-কর্তার লোক গিয়ে হাজির।কর্তার চেয়েও ভাব বেশি তার। ভীষণ ব্যস্ত তিনি, বেশিক্ষণ বসার সময় নেই। তাছাড়া মস্তবড় (!) সাংবাদিক পাঠিয়েছেন বলে কথা! কাজটি আন্তরিকভাবে করতে গিয়ে এসিল্যান্ড দেখলেন জমিটির দলিল জাল। লোকটির দাবি এই জাল দলিল দিয়েই নামজারি করতে হবে। ফোনে লাগিয়ে দিলেন বড় সাংবাদিককে (!)। তার বক্তব্য আরো কড়া।

বললেন, জাল দলিল বলেই তো পাঠিয়েছি। তা না হলে আপনার কাছে কেন পাঠাবো। সাংবাদিকের (!) অদ্ভুত আবদারে গলা জড়িয়ে যায় এসিল্যান্ডের। এমন আবদারের জবাব তার কাছে না থাকারই কথা! সাংবাদিক-শক্তিতে বলীয়ান লোকটি (গাড়ির চালক) একপর্যায়ে দলিল ছুড়ে মারে এসিল্যান্ডের মুখে। অনাহুত, অভদ্র লোকটিকে দুইমাসের দণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠালে সাংবাদিক-কর্মকর্তা এসিল্যান্ডকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।

৭ দিনের মাথায় বের করে এনে ক্ষমতা দেখান ওই সাংবাদিক। এরপরের ক্ষমতা দেখাতে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ নিয়ে হাজির হন সাংবাদিক-কর্মকর্তা। অভিযোগ করেন, এসিল্যান্ড পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে তার লোকের বুকের পাঁজর ভেঙে দিয়েছেন।

প্রশ্ন উঠে, বুকের পাঁজর ভাঙলে কারাতত্ত্বাবধানে আহত লোকটির হাসপাতালে থাকার কথা। তাছাড়া এত বড় ঘটনা ঘটার তিনমাস পর কেন অভিযোগ? কাজেই অভিযোগ ধোপে টিকলো না। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ওই সাংবাদিক-কর্মকর্তা নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের জাল পাঁতেন এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে।

গতকালের ঘটনা সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ বলে ইতিমধ্যে জেনেছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। নারী কেলেঙ্কারির গল্প তৈরির হোতা সাংবাদিক দাবিদার মফস্বলের ওই যুবকটি আর শহুরে সাংবাদিক-কর্মকর্তা পরস্পর এক আত্মা, একই অভিরুচির। তাদের উদ্দেশ্য এক- যেনতেনভাবে স্বার্থ হাসিল করা। এর ব্যত্যয় হলেই তারা ফাঁদ পাতছে, অপকমের বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে! ও হ্যাঁ, দুই লাখ টাকার দফারফায় জাল দলিলে ভূমির নামজারির কন্টাক্ট নিয়েছিলেন ওই সাংবাদিক-কর্মকর্তা।

ছি : নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। শুধু বলি, এই অপসাংবাদিকতার শেষ কোথায়! ধিক, শতধিক তাদের!