ঢাকা, , শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯

উপজেলা নির্বাচনে যাওয়া অনিশ্চিত বিএনপির

প্রকাশ: ২০১৯-০১-১৩ ১২:১৪:১৬ || আপডেট: ২০১৯-০১-১৩ ১২:১৪:১৬

আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষ দেখা না-ও যেতে পারে। দলগতভাবে এ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পক্ষে বিএনপির বেশিরভাগ নেতা। এই অবস্থায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

গত শুক্রবার রাতে গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতারা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া না-নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। কিন্তু বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বৈঠক সূত্রে জানা যায়, বিএনপি যদি শেষ পর্যন্ত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, তবে দলের কোনো নেতা প্রার্থী হলেও দলীয় প্রতীক বরাদ্দ পাবেন না। সে ক্ষেত্রে স্বতন্ত্রভাবে ওই নেতাকে নির্বাচন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যিনি প্রার্থী হবেন, তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে না।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১৪ সালে ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম ধাপে ৯৭ উপজেলায় নির্বাচন হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপে ১১৭ উপজেলায় ভোট হয়। ওই বছর সব মিলিয়ে ৭ ধাপে ভোটগ্রহণ হয়। তবে গতবার নির্দলীয়ভাবে উপজেলা নির্বাচনে ভোট হলেও এবার হবে দলীয় প্রতীকে। আগামী মার্চে কয়েক ধাপে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এই আলোকে এ মাসের শেষে অথবা আগামী মাসের শুরুতে তফসিল ঘোষণা হতে পারে। তবে ইসির সিদ্ধান্তের ওপরই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ভর করছে।

এদিকে সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচন শেষে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ঘোষণার পর এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া না-নেওয়ার বিষয়ে দলটির বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের কাছে মতামত নেওয়া হয়েছে। এসব নেতাও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পক্ষে জোরালো মতামত দেন।

বিএনপির দুই স্থায়ী কমিটি সদস্য, দুই যুগ্ম মহাসচিব ও একাধিক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে গতকাল আমাদের সময়ের এ প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। তারা সবাই অভিন্ন সুরে মতামত দিয়ে বলেছেন, গত ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনই প্রমাণ করে, বর্তমান সরকার ও সিইসির অধীনে যে কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়া হবে অর্থহীন। কারণ এই সরকারের অধীনে বিগত সময়ে কোনো নির্বাচন যেমন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি, আগামীতেও কোনো সম্ভাবনা তারা দেখছেন না।

বরং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির দুটি লাভ দেখছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাবে, তারাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নৌকা পাওয়া নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাবে। কেউ কেউ বিদ্রোহীও হবে। এই সংঘাত মেটাতেই ক্ষমতাসীনদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যস্ত থাকবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর যে হামলা-মামলাসহ নানা নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে, এটা কিছুটা হলেও কমে আসবে।

তবে দলের একটি অংশ মনে করেন, গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির নির্বাচনে যাওয়া উচিত। তা হলে জাতীয় নির্বাচনের মতো উপজেলা পরিষদেও ভোট জালিয়াতিসহ একই চিত্র দেশবাসী ও বহির্বিশ্ব জানবে। ফলে বিএনপির নিরপেক্ষ সরকারের দাবির পক্ষে সমর্থন আরও জোরালো হবে। অন্যদিকে দলের কোনো কোনো স্থানীয় নেতা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজে থেকে প্রার্থী হতেও পারেন। জনপ্রিয়তা অনুযায়ী কোনো কোনো নেতা বিজয়ী হতে পারেন। বিএনপি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ না নিলে জাতীয় নির্বাচনের বদনাম ঘোচাতে সরকার এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ‘নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়ার বিষয়ে দল সিদ্ধান্ত দেবে। তবে আমরা নির্বাচনে গেছি, আমাদের নির্বাচনে যাওয়া উচিত। কারণ গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। সুতরাং নির্বাচনে হয়তো যাবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হবে না; এই নির্বাচন হবে অবাধ ও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে। এই নিশ্চয়তার ওপর ভিত্তি করে আমরা নির্বাচন করতে পারি।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বৃহস্পতিবার বিকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বিএনপির সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও লন্ডন থেকে স্কাইপিতে এই বৈঠকে যুক্ত ছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে নেতারা তাদের মতামত দেন। তারেক রহমান ওই বৈঠকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া না-নেওয়ার বিষয়ে মতামত চান। সেখানে উপস্থিত সবাই নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মতামত দিয়ে প্রায় অভিন্ন সুরে বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে ভোট ডাকাতির নির্বাচন বলছি। এখন যদি সেই সিইসির অধীনেই উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিই, তা হলে বিশ্বাযোগ্যতা নষ্ট হবে।

তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের মতামত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া কোনোভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। কারণ হিসেবে তারা মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনের মতো এই নির্বাচনও ক্ষমতাসীনরা জোর করে নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে নিতে পারে। বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনই প্রমাণ করে দলীয় সরকার ও বর্তমান সিইসির অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে না। এই অবস্থায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যদি উপজেলা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা হবে রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী।-আমাদের সময়